আহকামের চে’ আফকারই প্রিয় হয়ে উঠছে!

শায়খ আব্দুল্লাহ নাজীব

ইসলামের সাথে আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে সাধারণত আহকামের মাধ্যমে। আহকামের ভিত্তিতেই আমরা নির্ণয় করি কে কতটা ধার্মিক। সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান ও হুকুম-আহকাম যে যতবেশি পালন করে, তাকে আমরা তত বড় ধার্মিক মনে করি।

আমরা কেউ ধার্মিক হতে চাইলে, হুকুম-আহকামের প্রতি যত্নশীল হই। কোন কাজে কী বিধান রয়েছে তা জানার চেষ্টা করি। বই পড়ে বা কোনো আলেমকে জিজ্ঞাসা করে ইসলামের বিধান ও সমাধান জানি। একারণে ইসলামী বইগুলোর মাঝে আহকামের চর্চাই বেশি হয়েছে। সংক্ষেপে বা বিস্তারিতরূপে আলোচিত হয়েছে ইসলামের বিধি-বিধান।

অথচ ইসলামের আহকাম যেভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত, আফকারও সেভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। যেভাবে প্রতিটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, সেভাবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট একটি দর্শনও রয়েছে। ইসলাম যেমনি জীবন-বিধান দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে জীবন-দর্শনও। ইসলাম পুত্রকে পিতা-মাতার হক আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছে। পিতা-মাতাকেও নির্দেশ দিয়েছে সন্তানের হক আদায় করতে। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদনের নির্দেশও প্রদান করেছে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশির হক-হুকুমও সুন্দররূপে নির্ণিত হয়েছে।

এসবই আহকাম। আহকামে যিন্দেগী। এই আহকাম দিয়ে মূলত ইসলাম ফ্যামিলি সিস্টেম ও পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করতে চেয়েছে। আমরা আহকামগুলো বলি এবং জানার চেষ্টা করি। আহকামভিত্তিক আলোচনা ও রচনাও করি। কার কী হক? কোথায় কী বিধান? তা দলীলসহ উপস্থাপন করি।

কিন্তু এই ফ্যামিলি সিস্টেমের দর্শন ও ফালসাফা কী- তা কমই আলোচনা হয়। বা একদমই হয় না। অথচ ইসলাম সুনির্দিষ্ট চিন্তা ও ইস্কিমের ভিত্তিতে উপর্যুক্ত আহকাম দিয়েছে। আহকামগুলো সুনির্দিষ্ট দর্শনকে ঘিরে আবর্তিত৷

এবার ভিন্ন একটি চিত্র দেখুন, বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতায় ছোট-খাটো আহকামের আলোচনা খুবই কম। তারা মানুষের আহকামে যিন্দেগীর চেয়ে আফকারে যিন্দেগী নিয়ে বেশি আলোচনা করে। তারা যখন নিজেদের সভ্যতা কারও উপর চাপিয়ে দিতে চায়; তখন সাধারণ বিধি-বিধান ও আহকামকে আলোচনার টেবিলে আনে না। তারা বুঝায় শুধু দর্শন ও ফালসাফা। এভাবে নিজেদের আফকারের সুক্ষ্মতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বুঝানোর চেষ্টা করে।

অন্যদিকে আমাদের মাঝে আফকারের আলোচনা কম হওয়ায়; আমরা সঠিক উত্তর দিতে পারি না। নিজেদের সুক্ষ্মতা ও শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হই। এক পর্যায়ে পশ্চিমাদের চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে পড়ি। আমাদের সমাজে আজ ফ্যামেলি সিস্টেম কমে যাচ্ছে এবং ব্যক্তিবাদ বেড়ে যাচ্ছে৷ অবাধ স্বাধীনতারও ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। এগুলো মূলত পশ্চিমাদের আফকারে প্রভাবিত হওয়ার কারণে। তাই বলা যায়, “বর্তমানে চলছে সভ্যতার লড়াই ও চিন্তার খেলা।”

হাকীমুল ইসলাম কারী তাইয়েব রাহ. সুন্দর বলেছেন,
آج کی جنگ عقائد کی نہیں بلکہ نظریات کی ہے
বর্তমানের আগ্রাসন বুদ্ধিবৃত্তিক। আকীদাভিত্তিক নয়। (তারীখে দারুল উলূম দেওবন্দ: মুকাদ্দিমা, পৃ. ২০)

সাম্প্রতিককালে সাধারণ শিক্ষিতদের মাঝে জীবন-দর্শন ও আদর্শিক চিন্তা-চেতনা জানার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে আহকামের চে আফকারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অনেকে নিজেদের বক্তব্যে ইসলামের ফিকির ও চিন্তা তুলে ধরছেন৷ কেউ কেউ আছেন পশ্চিমা আফকারের রদে, নিজের থেকে ভুল-ফিকির প্রচার করছেন। শ্রোতারাও তা গ্রহণ করছেন। যেহেতু বর্তমানে আফকার ও জীবন-দর্শন গ্রহণ করার আগ্রহ ও প্রবণতা রয়েছে তাঁদের। ফলে যে সব বক্তা সাহেবান ইসলামী আফকার ও জীবন-দর্শন কেন্দ্রিক আলোচনা করেন; তাদের আলোচনা খুব সহজেই মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

তো বর্তমানে আফকারে ইসলাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একইসাথে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতরও। যেহেতু মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, তাই বিজ্ঞ আলেমদের এদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া কাম্য।

Share on facebook
Facebook

Facebook

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

উজবেকিস্তান সফরের কারগুজারি

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়ার মুহতামিম হযরত মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান (হাফিযাহুল্লাহ), মাওলানা তাহমীদুল মাওলা (হাফিযাহুল্লাহ), মাওলানা তাফহীমুল হক হবিগঞ্জী (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ

Read More »