বড়দেরকে বড় কাজের জন্য ফারিগ করে দিই

মাওলানা শিহাব সাকিব

আমরা বড় ও যোগ্য আলেমদের নানাভাবে অবমূল্যায়ন করি। কখনও ইচ্ছায়, কখনও অনিচ্ছায়। বুঝে, না বুঝে। আমরা তাদের মেধা ও শ্রম অপাত্রে ব্যবহার করি। নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থে তাদের দামি সময় নষ্ট করি। ভদ্রতার কারণে তারা কিছু বলতে পারেন না।
*

কিছু কাজ আছে যা সম্পাদন করতে খুব বেশি যোগ্যতা ও ইলমের প্রয়োজন হয় না। সেটা দীনি হোক বা জাগতিক হোক। সাধারণ জ্ঞান ও ইলমের মাধ্যমেই তা করে ফেলা যায়। আর কিছু কাজ আছে এমন যা যে কেউ সম্পাদন করতে পারে না। এর জন্য বিশেষ যোগ্যতা ও মেধার দরকার হয়।

এটা খুবই সাধারণ কথা। কিন্তু আমাদের সমাজে এর ব্যাপক অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। সামান্য, ছোট ছোট ও তুলনা মূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড়দেরকে কষ্ট দিই, তাদের মহা মূল্যবান সময় নষ্ট করি। এসব কাজ থেকে যদি তাদেরকে ফারিগ করে দিতে পারতাম, তারা উম্মাহর জন্য আরও বেশি দরকরি ও প্রয়োজনীয় কাজে নিজেদের সময় ব্যয় করতে পারতেন।
*

বড়রা তাদের উচ্চ আখলাক ও শরাফাতের কারণে আমাদের তুচ্ছ তুচ্ছ দাবি, আবদার রক্ষা করতে বাধ্য হন। তাদের থেকে উম্মাহর উপকৃত হওয়ার যে বিরাট সম্ভাবনা থাকে তার মাঝে আমরা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াই। এসব থেকে বেঁচে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
*

পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম ওলি হাসান খান রহ. সম্পর্কে মুফতি তাকি উসমানি সাহেব লিখেন, “তার অসাধারণ মেধা ও যোগ্যতার কারণে সব সময় আমি কামনা করতাম যে, তার জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ রচনার কাজে ব্যয় হোক। এতে তার ইলম ও পাণ্ডিত্য দ্বারা আরও অনেক মানুষ দীর্ঘদিন উপকৃত হতে পারবে। কিন্তু মুফতি সাহেবের স্বভাবগত ভদ্রতা ও নম্রতার কারণে তার অধিকাংশ সময়ই সমায়িক প্রয়োজন পূরণে ব্যয় করতে বাধ্য হতেন, নানাজনের চাপের মুখে।
*

তিনি আরও লিখেন, আফসোসের বিষয় এই যে, আমাদের সমাজে এই পরিবেশ নেই যে প্রত্যেক ব্যক্তি থেকে তার স্বভাব ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ ব্যবহার হবে। বরং রসম রেওয়াজের পেছনে অনেক সময় নষ্ট করা হয়।

মুফতি সাহেব একজন ইলমি ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কখনও সাংগঠনিক লোক ছিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে বলুন, কিংবা যোগ্যতার অবমূল্যায়ন বলুন, তার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অনেক বড় অংশ এসব কাজেও খরচ হয়েছে। বিয়ে, উদ্বোধন, মাহফিলের সভাপতিত্ব ইত্যাদির মত রেওয়াজি আচার অনুষ্ঠানে তাকে সময় দিতে হয়েছে।

কিন্তু তার বিস্তৃত অধ্যয়ন, গভীর পাণ্ডিত্য ও ইলমের ফসলকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত করার দিকে যথাযথ দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। এজন্য যেসব কাজে শুধু তার প্রতিই দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকত সেসব কাজ অপূর্ণই রয়ে গেছে।” -নুকুশে রফতেগা, ৩৮০, ৩৮১।
*

বড়দের আশেপাশে যারা থাকেন, পরিবার ও ঘনিষ্ঠজন, তাদের উচিৎ এই বিষয়গুলোর প্রতি একটু বাড়তি মনযোগ দেয়া। ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্বের খাতিরে তাদেরকে দিয়ে অন্যায় আবদার পূরণ করানো থেকে সব সময় দূরে থাকা কাম্য। তাদের যোগ্যতা ও মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা আমাদের কর্তব্য।
*

এবিষয়ে মুফতি তাকি উসমানি সাহেব অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি তার সাক্ষাৎ প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে যে নিয়ম নীতি লিখে রেখেছেন তাতে আছে, “উদ্বোধন, বিয়ের অনুষ্ঠান, সমাপনি অনুষ্ঠান, সাধারণ মাহফিল বা বার্ষিক মাহফিল ইত্যাদিতে উপস্থিত হওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে ছেড়ে দিয়েছি।”– মোবাইল ও সাক্ষাৎ: আদাব ও মাসায়েল, পৃষ্ঠা: ৭৭।
*

কোন কোন আলেম নিজের জন্যে রুটিন ও নিয়ম নীতি বানিয়ে নেন। এর প্রতি সর্বোচ্চ লক্ষ্য রাখা আমাদের কর্তব্য।
এবিষয়ে মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব লিখেন, অবস্থার প্রেক্ষিতে কেউ যদি সময়ের রুটিন বানিয়ে নেয় তবে তা তাকাব্বুরির অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং তা হক আদায়ে যত্নশীলতা ও সময়ের গুরুত্বের পরিচায়ক। তেমনি কারো সাথে মেলামেশার সময় তার নীতি ও নেজামের প্রতি লক্ষ্য রাখার মধ্যেও অপমানের কিছু নেই। বরং তা ভদ্রতা ও শরাফতের প্রমাণ বহন করে।

তিনি আরও লিখেন, কেউ কেউ নেজামের কথা বলতে লজ্জাবোধ করে। স্বভাবজাত লজ্জার উপর যুক্তি ও ইনসাফের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া কর্তব্য।”– (মোবাইল ও সাক্ষাৎ: আদাব ও মাসায়েল, পৃষ্ঠা: ৭৯, ৮০)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বড়দের সাথে আদব রক্ষা করে তাদের থেকে সর্বোচ্চ ইসতিফাদার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Facebook

সাম্প্রতিক প্রবন্ধ

উজবেকিস্তান সফরের কারগুজারি

জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়ার মুহতামিম হযরত মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান (হাফিযাহুল্লাহ), মাওলানা তাহমীদুল মাওলা (হাফিযাহুল্লাহ), মাওলানা তাফহীমুল হক হবিগঞ্জী (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ

Read More »